ভ্রমণ করে আসলাম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খেরুয়া মসজিদ (Kherua Mosque) – শেরপুর, বগুড়া থেকে। বাংলাদেশের বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার খন্দকার টোলা এলাকায় এই খেরুয়া মসজিদ অবস্থিত।

বগুড়া ভ্রমণের আজকের আর্টিকেলে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খেরুয়া মসজিদ নিয়ে বিস্তারিত বলব। তবে তার আগে বলে নেই, আজকের ভ্রমণে বাহন হিসেবে ছিল মোটরসাইকেল এবং ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে রয়েছি আমি আপনার ভ্রমণ বন্ধু আরিফ হোসেন এবং আমার সাথে রয়েছে মোহাইমিনুল ইসলাম, মনির এবং কর্নেল জসিম।

চলুন শুরু করা যাক…

আরওঃ মিনি কক্সবাজার চাঁদপুর ভ্রমণ

খেরুয়া মসজিদ – শেরপুর, বগুড়া

খেরুয়া মসজিদ


প্রায় ৪৩৭ বছর পুরনো খেরুয়া মসজিদ ভ্রমণের শুরুতে প্রথমে আমরা খেরুয়া মসজিদ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু তথ্য জেনে নিব।

খেরুয়া মসজিদ ভ্রমণ তথ্য

ভ্রমণ স্থান খেরুয়া মসজিদ
ধরন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
অবস্থান খন্দকার টোলা, শেরপুর, বগুড়া
স্থাপিত ১৫৮২ইং
স্থাপন করেন মির্জা মুরাদ খান কাকশাল
গম্বুজ সংখ্যা ৩টি
পদার্থ চুন, সুরকি, কৃষ্ণ পাথর
মুসল্লি ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৯০ জন
আয়তন ৫৯ শতক
মালিকানা বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর
ঢাকা থেকে দূরত্ব ১৬৬ কিলোমিটার (প্রায়)
বগুড়া থেকে দূরত্ব ২৮ কিলোমিটার (প্রায়)

সময়সূচী

খেরুয়া মসজিদ সপ্তাহিক খোলা থাকার সময় সূচী।

শনিবার ০৬:০০-৬:০০
রবিবার ০৬:০০-৬:০০
সোমবার ০৬:০০-৬:০০
মঙ্গলবার ০৬:০০-৬:০০
বুধবার ০৬:০০-৬:০০
বৃহস্পতিবার ০৬:০০-৬:০০
শুক্রবার ০৬:০০-৮:০০

ইতিহাস

আজ থেকে প্রায় ৪৩৭ বছর পূর্বে মোগল পূর্ব সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে মোগল স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে জওহর আলী কাকশালের পুত্র মির্জা মুরাদ খান কাকশাল ১৫৮২ সালে বাংলাদেশের বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার খন্দকার টোলা এলাকায় বিখ্যাত ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট খেরুয়া মসজিদ নির্মান করেন।

খেরুয়া মসজিদ

তবে, মসজিদ নির্মাণ কারীর নাম নিয়ে একটু দ্বিমত আছে তা সরজমিনে ভ্রমণে গিয়ে জানতে পারলাম। অনেকে বলেন, খেরুয়া মসজিদ টি নির্মাণ করেছেন আব্দুস সামাদ ফকির।

কিন্তু, মসজিদে ঢুকার গেইটের সামনের দেয়ালে উৎকীর্ণ শিলালিপি তে গোল গোল করে লিখা রয়েছে মসজিদ নির্মাতা মির্জা মুরাদ খান কাকশাল। আমরা এটাই সঠিক বলে ধরে নিচ্ছি।

খেরুয়া মসজিদ এর বিশেষত্ব হচ্ছে, মসজিদ এর উপরে সম মাপের ৩টি বড় গম্বুজ রয়েছে।

খেরুয়া মসজিদ

আয়তন

খেরুয়া মসজিদ এর আয়তন ৫৯ শতক। অর্থাৎ সম্পূর্ণ মসজিদ এবং চারপাশে দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টি জমির পরিমাণ ৫৯ শতক।

মসজিদ এর ভিতরে ঢুকার জন্য দক্ষিন দিকে একটি ছোট লোহার গেইট রয়েছে। তার পাশেই একটি উৎকীর্ণ শিলালিপি বা সাইনবোর্ড রয়েছে। যেখানে খেরুয়া মসজিদ সম্পর্কে বাংলা এবং ইংরেজিতে সংক্ষিপ্ত বর্বণা দেয়া রয়েছে।

গেইট দিয়ে ঢুকার পর হাতের বা’দিকে মসজিদ টি দেখতে পাবেন। মসজিদ এর সামনে রয়েছে একটি বেশ বড় খালি মাঠ। মাঠের একপাশে আব্দুস সামাদ ফকির এর কবর। আর মসজিদ এর একেবারে উত্তর পশ্চিম দিকে রয়েছে ওয়ুখানা।

আরওঃ কলাকান্দা মসজিদ ও মাদ্রাসা

অবকাঠামো

খেরুয়া মসজিদটি ১.৮১ মিটার চওড়া। মসজিদ এর দৈর্ঘ্য ১৭.২৭ মিটার এবং প্রস্থ ৭.৪২ মিটার।

মসজিদ এর পূর্ব দিকের দেয়ালে ৩টি এবং উত্তর-দক্ষিণ দিকের দেয়ালে ১টি করে মোট ৫ খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে। সাথে পশ্চিম দিকের দেয়ালে রয়েছে তিনটি কারুকার্যখচিত মেহরাব।

কারুকার্যখচিত মেহরাব

৩ গম্বুজ মসজিদ

৩ গম্বুজ বিশিষ্ট খেরুয়া মসজিদ টি সম্পূর্ণ তৈরি হয়েছে চুন, সুরকি এবং বৃহদাকার কৃষ্ণ পাথর দিয়ে। এখানে কোন রড, সিমেন্ট, বালি ব্যাবহার করা হয় নি। তবে ১৫৮২ সালে নির্মানের পর থেকে এখন পর্যন্ত খেরুয়া মসজিদ টি বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে।

খেরুয়া মসজিদের উপরে বেশ বড় বড় ৩টি গম্বুজ রয়েছে। ৩টি গম্বুজের ফলে পুরো মসজিদ এর ছাদটি গম্বুজ দিয়ে ঢেকে রয়েছে।

৩ গম্বুজ মসজিদ

মসজিদ এর চার পাশে ৪টি পিলার রয়েছে। পিলারগুলো কারুকার্য করা।

পিলার

এছাড়া পশ্চিম দিক বাদে বাকি সব দিকেই মসজিদে ঢোকার দরজা রয়েছে। তবে, বর্তমানে শুধুমাত্র পূর্বদিকে একটি গেইট খোলা রয়েছে এবং এটিই ব্যাবহার করা হয়।

আরও দেখুনঃ ১ গম্বুজ মসজিদ

মসজিদ টি দেখতে বাগের হাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ এর মত!

খেরুয়া মসজিদ ভ্রমণ

তখন প্রায় দুপুর। প্রচন্ড রোদ। গ্রামের অলিগলি দিয়ে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা পিচ ঢালাই রাস্তা দিয়ে আমাদের মোটরসাইকেল এগিয়ে চলছে বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার খন্দকার টোলা গ্রামের দিকে। ঐখানেই রয়েছে বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খেরুয়া মসজিদ।

খেরুয়া মসজিদ এর উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল যাত্রা

শেরপুর থেকে মোটরসাইকেলে করে আমাদের খেরুয়া মসজিদে পৌঁছাতে ১৫-২০ মিনিট এর মত সময় লাগল।

আরওঃ আল মাদ্রাসাতুল আরাবিয়া ইসলামিয়া

রাস্তার ডান পাশে রয়েছে মসজিদটি। পাশে একটি মুদি দোকান। তার একটু সামনে দক্ষিণ দিকে মসজিদ এর প্রধান ফটক। আমরা গেইট এর একপাশে মোটরসাইকেল ২টি রেখে ভিতরে প্রবেশ করলাম। ভিতরে কোন লোকজন নেই।

খেরুয়া মসজিদ এর প্রবেশ পথ

খেরুয়া মসজিদ এর ভিতরে ঢুকেই যা দেখলাম

৩ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি ১৫৮২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ঠায় দাড়িয়ে রয়েছে। দেখে মনে হয় এখনও তরতাজা। বেশি দিন হয়নি বানানো হয়েছে তাকে।

খেরুয়া মসজিদ ভ্রমণে আমরা

মসজিদ এর চারপাশে উচু দেয়ালের বেষ্টনী রয়েছে। দেয়ালের চারপাশে রয়েছে নানা ফুল গাছ, ফল গাছ ও কাঠ গাছের সারি।

মসজিদ এর সামনে একটি কবর। উত্তর দিকে একটি ওয়ুখানা রয়েছে। এই মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। সাথে শুক্রবারের জুমার নামাজও আদায় করা হয়। একসাথে এই মসজিদে প্রায় ৯০ জন মুসল্লি নামাজ পরতে পারেন।

মসজিদ এর সামনের জায়গাটি ঈদগাহ হিসেবে ব্যাবহার করা হয়।

ঈদগাহ মাঠ

বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর

বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যতগুলো প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন রক্ষণাবেক্ষণ করেন তার ভিতরে খেরুয়া মসজিদ একটি। মসজিদ এর দেখাশোনা করা থেকে শুরু করে সংস্কার কাজ সহ যাবতীয় কাজ বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর করে থাকে।

বর্তমানে এই মসজিদ এর খাদেম বা দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন আব্দুস সামাদ সাহেব। তিনি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে ১৯৮৮ সালে নিযুক্ত হয়ে এখন পর্যন্ত এই মসজিদ এর দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন।

খাদেম আব্দুস সামাদ সাহেব এর সাথে মসজিদ নিয়ে আলোচনার সময়

খেরুয়া মসজিদ ভ্রমণ গাইড

ঢাকা থেকে খেরুয়া মসজিদ এর দূরত্ব প্রায় ১৬৬ কিলোমিটার। বগুড়া থেকে দূরত্ব প্রায় ২৮ কিলোমিটার। আর, শেরপুর উপজেলা সদর থেকে দূরত্ব প্রায় ১ কিলোমিটার।

আপনি শেরপুর সদর উপজেলা থেকে সিএনজি, রিকশা অথবা ভ্যানে করে যেতে পারবেন। মনে রাখবেন গ্রামের নামঃ খন্দকার টোলা।

ঢাকা থেকে বাস ভ্রমণ

ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার জন্য অনেগুলো পরিবহন রয়েছে। রাজধানী ঢাকার গাবতলী, মহাখালী, শ্যামলী, আবদুল্লাহপুর ও কল্যাণপুর থেকে প্রতিদিন বগুড়ার উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে বাস যোগে যেতে উল্লেখযোগ্য পরিবহন গুলো হলঃ

  • হানিফ এন্টারপ্রাইজ
  • শ্যামলী পরিবহন
  • এনা
  • এস আর ট্রাভেলস
  • মানিক
  • ডিপজল
  • আল হামরা
  • নাবিল
  • শাহ ফতে আলি
  • টি আর ট্রাভেলস

হুন্দাই এসি বাস সার্ভিস: তবে, এদের ভিতরে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এস আর ট্রাভেলস, নাবিল এবং মানিক পরিবহন এর ৩ সিট হুন্দাই এসি বাস সার্ভিস রয়েছে।

বাস টিকিট মূল্য: ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার বাস টিকিট সর্বনিম্ন ৩৫০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা পর্যন্ত।

ঢাকা থেকে ট্রেন ভ্রমণ

ঢাকা থেকে ২টি ট্রেন সার্ভিস রয়েছে। ট্রেন ২টি হলঃ লালমনি এবং রংপুর এক্সপ্রেস। ২টি ট্রেনই বগুড়া হয়ে যাতায়াত করে।

ঢাকা থেকে প্রতিদিন সকাল ৯টায় রংপুর এক্সপ্রেস এবং রাত ১০ টা ১০ মিনিটে লালমনি এক্সপ্রেস কমলাপুর রেলস্টেশন ছেড়ে যায়।

তবে, রংপুর এবং লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেন যথাক্রমে রবিবার এবং শুক্রবার বন্ধ থাকে।

কোথায় থাকবেন

বগুড়া থকার জন্য রয়েছে পাঁচ তারকা হোটেল, মোটেল, কটেজ এবং গেস্ট হাউজ। এখানে থাকার ব্যাবস্থা বেশ উন্নত। আপনি কম খরচেও থাকার জন্য ভালো মানের হোটেল পাবেন।

বগুড়ার কিছু উল্লেখযোগ্য হোটেল এর নামঃ

  • হোটেল নাজ গার্ডেন
  • হোটেল মম ইন বগুড়া
  • হোটেল সিএসটা
  • পর্যটন মোটেল
  • আকবরিয়া হোটেল
  • হোটেল রয়াল প্যালেস, উপশহর
  • হোটেল সান ভিউ, শেরপুর রোড

ট্রিপডো ফেসবুক: TripDaw