খোদাই পুকুর রহস্য – মতলব, চাঁদপুর। সময়টা ১৯৮৮ সাল, শমশের সাহেব বাড়ির উঠনে একটা চেয়ারে বসে আছেন। একটা পিচ্চি ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে শমশের সাহেবের দিকে দৌড়ে এসে খবর দিলেনঃ চাচা বান ছুইট্টা গেছে, আপনি হুনছেন?

শমশের সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বলিস কি ফাহিম। কহন ছুটল!

একটু আগে, আব্বায় গঞ্জ থেইকা হুইনা আইছে।

এখন তোর আব্বায় কই?

আব্বায় মারে লইয়া সব কিছু বস্তায় ভরতাসে, নানা বাড়ি চইলা যামু আমরা। আমি ফাকে তোমারে খবরডা দিতে আইসি।

………।

এভাবে করেই ১৯৮৮ সালের বাঁধ ছুটার খবর যায় ছলিমুদ্দি, করিমুদ্দি সবার বাড়ি তে।

আরও পড়ুন: চিড়িয়াখানা ভ্রমণ – মিরপুর, ঢাকা

বাঁধ ছুটার জায়গা

বাঁধ ছুটে মতলব উত্তর এর সিফাইকান্দির রাস্তা ভেঙ্গে। মতলব উত্তর এর চারপাশে নদী বয়ে গেছে। চারপাশে নদী , মাঝখানে মানুষের বসবাস।

এককথায় বলা যায় একটা চর এর মত! তবে এটা যেই সেই চর না। বিশার তার ব্যাস। মতলব বাজার থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার দূরত্ব এই খোদাই পুকুর এর।

খোদাই পুকুর এর জন্ম

খোদাই পুকুর এর জন্ম হয়েছিল পানির স্রোতের মাধ্যমে! কিভাবে? চলেন সেটাই বলছি…।

খোদাই পুকুর রহস্য – মতলব, চাঁদপুর

১৯৮৮ সালে যখন বাঁধ ভেঙ্গে নদীর পানি বেড়িবাদ এর ভিতরে প্রবেশ করতে থাকে তখন, পানি তার ধারা অনুযায়ী নিচু এলাকার দিকে প্রবাহিত হতে থাকে।

নবুরকান্দী, রাঢ়ী কান্দী, কাজী কান্দি, মান্দ্রতলী এই সব গ্রাম গুলো নিচু এলাকায় ছিল। আর, নবুরকান্দি রাঢ়ী কান্দি এই সব গ্রাম গুলো পলিমাটির হওয়ায় মাটিতে ছিল প্রচুর বালু।

তখন বেড়ীবাদ এর ভিতরেও বেশ উচু উচু রাস্তা ছিল। যার ফলে পানির ধাক্কা গুলো প্রথমে সে সব রাস্তা গুলো তে আঘাত করত। এর পর সেই রাস্তা গুলো ভেঙ্গে পানি আরো ভিতরে প্রবেশ করত।

তেমনি ভাবে মতলব বেড়ীবাদ থেকে একটা রাস্তা সোজা নবুর কান্দি হয়ে কাজী কান্দি আর রাঢ়ী কান্দি দিয়ে চলে গিয়েছে।

১৯৮৮ সালের সেই বন্যায় বাঁধ ছুটে পানির ধাক্কা এই রাস্তায় ও আঘাত হেনে ছিল। যেহেতু এখান কার মাটি ছিল পলিমাটি। মাটি তে ছিল প্রচুর বালু।

পানির ধাক্কায় রাস্তা ভেঙ্গে যখন পানি সজোর গতিতে ভিতরে প্রবেশ করতে ছিল, তখন পানি উপর থেকে নিচে পরে এক বিশাল গভির খাঁদ এ পরিনত হয়েছিল।

এই অবস্থা শুধু এখানেই নয়! আরো অন্যান্য রাস্তার যে সব জায়গা দিয়ে রাস্তা ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করেছিল, সে সব জায়গা গুলো তে গভীর খাঁদ এর সৃষ্টি হয়।

পরবর্তীতে যখন বন্যার পানি কমে গিয়েছিল, তখন সেই গভীর খাঁদ গুলো মানুষ তাদের গোসল এবং তার খাবার পানির জন্য এই খাঁদ গুলো ব্যাবহার শুরু করে দেয়।

আরও পড়ুনঃ জাতীয় স্মৃতিসৌধ ভ্রমণ সাভার, ঢাকা

খোদাই পুকুর এর নামকরণ

খোদাই পুকুর এর নামকরণ করা হয়েছিল এভাবে…।

পরবর্তীতে যখন বন্যার পানি একেবারে শুকিয়ে যায় তখন, রাস্তা ভেঙ্গে খাঁদ হওয়া ছোট জায়গা গুলো আসতে আসতে মিলে যায়।

আর, বড় খাঁদ হওয়া জায়গা গুলো থাকে যায় এবং মানুষ সেগুলো পুকুর হিসেবে ব্যাবহার করতে থাকে। তারপর একটা সময় বড় বড় খাঁদ গুলোও মিলে যায়!

কিন্তু, রাঢ়ী কান্দি এবং কাজী কান্দি গ্রাম এর মাঝ খানে সৃষ্টি হওয়া বিশাল এই খাঁদ টি আর মিলে যায় নি। এটি রয়ে যায়।

যেহেতু এই পুকুর টি মানুষের সৃষ্টি নয় তাই, এই পুকুর এর নাম খোদাই পুকুর নামে প্রচার হতে থাকে।

আরও পড়ুন: জজ নগর পার্ক ও মিনি জো

খোদাই পুকুর রহস্য

খোদাই পুকুর রহস্য নিয়ে বলে শেষ করা যাবে না। তার কারন, ১৯৮৮ সালে এই পুকুর এর সৃষ্টি হলেও… এটি নিয়ে নানা রহস্য রয়েছে।

যেমনঃ আমি যখন ছোট ছিলাম তখন, এই পুকুরে যখন গোসল করতে যেতাম… তখন আমি ভুলেও পুকুর এর গভীরে যেতাম না!

কারন, এখানে আমাদের কে বলা হয়েছিল, পুকুরে নাকি ডেগ আছে!

যারা ডেগ মানে বুজতে পারছেন না তাদের জন্য বলছিঃ ডেগ একটা আঞ্চলিক শব্দ। এর মানে পুকুরে শিকর দিয়ে পাতিল এর মত বিশাল এক বস্তু থাকত। যেটা মানুষ কে টেনে পানির নিচে নিয়ে যেত।

তাই আমরা ভুলেও পুকুরের গভীরে যেতাম না।

খোদাই পুকুর এর গভীরতা

খোদাই পুকুর এর গভীরতা কখন পরিমাপ করা হয় নি! তাছাড়া অন্যান্য পুকুর শীত এর সময় সেচ করা হলেও, এটা সেচ করা সম্ভব হয় নি!

এর ২টা কারন আছে; ১টা হচ্ছেঃ আমরা আগে জানতাম যে, এই পুকুর এতো গভীর যে এটা কখনো সেচ করা সম্ভব না!

২য় কারন টা হচ্ছে, আসলে এই পুকুরটি যেহেতু পলিমাটির উপর, তাই সেচ করতে চাইলেও সম্ভব হয় না – মাটির নিচ থেকে পানি উঠে আসে।

খোদাই পুকুর এর বর্তমান অবস্থা

খোদাই পুকুর -এ বর্তমানে মাছ চাষ করা হয়। আর আশেপাশের গ্রাম গুলো থেকে মানুষ এখানে তাদের খাবারের পানি এবং গোসল করার জন্য এই পানি ব্যাবহার করে থাকে।


ট্রিপডো ইউটিউব চ্যানেলঃ TripDaw